ভারতে লাখ লাখ মুসলিমের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দেশটির হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে, যার জেরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রকিয়া এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১শ’ ৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে মানুষের ভোটাধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী দলকে সুবিধা দিচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
বিরোধীদের দাবি, মোদির নিয়োগ দেওয়া ভারতের নির্বাচন কমিশন ভুয়া, মৃত ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা পরিশোধনের নির্দেশ দেওয়ার পর, তথাকথিত যোগ্যতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থতার উছিলায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং শত শত বিরোধী সংসদ সাংসদ নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেছেন। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকা সংশোধন বাতিল এবং কাগজের ব্যালটে ভোট ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকালে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে জোরপূর্বক কিছু সময়ের জন্য আটক করে। তাঁকে দিল্লি পুলিশ জানায়, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, সেজন্য বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দিতে মোদির নির্দেশে কুমার ভোটার তালিকা সংশোধন করেছেন। দেশটির তরুণ প্রজন্মের ‹ককরোচ জনতা পার্টি›-এর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনÑমুম্বাই ও দিল্লিতে কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করার চার দিন পর এই নতুন বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। তারা এই কর্মসূচিকে দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছে এবং ১০ অক্টোবর আরও বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে।
এর আগে, বিহারে ২০২৫ সালের জুন মাসে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরে তা অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ভারতের ২০ কোটি মুসলিমকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, কারণ তাঁদের মোদির দলকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম।
তথ্যের অসঙ্গতির উছিলায় কয়েক কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে, মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত কয়েকজন নিজেদের জীবিত থাকার প্রমাণ দিয়ে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। আবেদন করা লাখ লাখ মানুষের বিষয়টি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে এবং চলতি বছরের শুরুতে তাদের নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। হাজার হাজার মানুষ নথিপত্র জমা দিতে শত শত মাইল দূরের গ্রামে যাতায়াত করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার আঠারোবাঁকির বাসিন্দা রুকসানা আমির ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে এ কথা বলেন, “আমরা দিন আনি দিন খাই; ভোটাধিকার হারানো ঠেকাতে গ্রামে যাতায়াত করতেই আমাদের জমানো টাকার বড় অংশ খরচ হয়ে গিয়েছে। সবার ভাগ্য অবশ্য এতটা ভালো নয়, পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় না থাকায় তাঁকে দুবার মুম্বাই থেকে গ্রামে ছুটে আসতে হয়েছে।” তিনি জানান, তাঁর চাচার চার সদস্যের পরিবারকেও ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
কুমার অন্য সদস্যদের অনুমোদন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এমন অভিযোগ সংক্রান্ত একটি আবেদনের পর দেশটির সর্বোচ্চ আদালত মোদি সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং কুমারকে নোটিশ দিয়েছেন। আদালত একটি স্বচ্ছ জবাব প্রত্যাশা করেছে। সর্বোচ্চ আদালতের সাবেক বিচারপতি রোহিন্টন নারিম্যান বলেন, “আমাদের গণতন্ত্রের প্রান, অর্থাৎ ভোটাধিকার, আজ চরম বিপদের সম্মুখীন।”
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ