
শিফাত উল্লাহ একজন সাহসী ও বীর বিক্রমের মতো ছিল। সে জানতো আন্দোলনে গোলাগুলি হচ্ছে, মানুষ মারা গেছে, আরও মারা যেতে পারে। তারপরও সেই মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সামনের সারিতেই ছিল শিফাত উল্লাহ। মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে তার অনেক বড় ভূমিকা ছিল দেশ যেন স্বৈরাচারমুক্ত হয় এবং দেশটা যেন সুন্দর ও বৈষম্যমুক্তভাবে চলে। আমার ছেলে শিফাত উল্লাহকে নিয়ে আমাদেরও অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ না করেই সে চলে গেছে। শিফাত উল্লাহ শহীদ হয়েছে, এটা আমার জন্য কষ্টের হলেও গর্বের। এখন ইনসাফের সঙ্গে সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা হলেই কেবল আমার ছেলের স্বপ্ন পূরণ হবে।
অশ্রুসজল চোখে এভাবেই জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ছেলে মুহাম্মদ শিফাত উল্লাহ’র কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয় সন্তানের আত্মদান আর স্বপ্নের কথা বলছিলেন বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামান। শহীদ মুহাম্মদ শিফাত উল্লাহ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের মুনিয়ারীকান্দা গ্রামের হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামানের ছেলে। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম এতিমখানা ও মাদ্রাসায় মাওলানা লাইনে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন শিফাত। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সক্রিয় ছিলেন জুলাইয়ের ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলনে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিনও মিছিল আর স্লোগানে প্রতিবাদের ঝাণ্ডা উড়িয়েছিলেন শিফাত। সেইদিনই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনাটি। মিছিল থেকে আর মাদ্রাসায় ফিরতে পারেননি শিফাত।
মাওনা ২নং সিঅ্যান্ডবি এলাকায় বিজিবি’র গুলিতে প্রাণ হারান মাত্র ১৮ বছর বয়সী অকুতোভয় শিফাত। কয়েক ঘণ্টা তার মরদেহ পড়ে ছিল রাস্তায়। বাদ আসরের পর সহপাঠী এবং আন্দোলনকারীরা শনাক্ত করেন শিফাতের মরদেহ। মাগরিবের নামাজের পর মাদ্রাসা থেকে ফোন করে শিফাতের আত্মদানের বিষয়টি বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামানকে জানানোর পরই জ্ঞান হারান তিনি। পরে মরদেহ মুনিয়ারীকান্দা গ্রামে এনে সমাহিত করা হয়। এদিকে দুই বছরেও শিফাতের মৃত্যুশোক ভুলতে পারেনি পরিবার। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে এখনো নীরবে চোখের জল ফেলেন বাবা ও মা মোছা. কামরুন্নাহার। ছোট ভাইয়ের স্মৃতি মনে করে শূন্যতায় হাহাকার করে ওঠেন বড় ভাই হিযবুল্লাহ। ভাইয়ের কথা মনে করে কান্নায় ভাসে ছোট দুই বোন নাইমা আক্তার ও নাসিহাত জান্নাত। যখনই ছেলের কথা বেশি মনে পড়ে বাবা মাওলানা নূরুজ্জামান ছুটে যান শিফাতের কবরে। কবরের পাশে দাঁড়িয়েই সান্ত্বনা খুঁজেন তিনি। মুনিয়ারীকান্দা গ্রামে গিয়ে শহীদ শিফাতের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হয় তার বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামানের সঙ্গে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শিফাত আমার দ্বিতীয় ছেলে। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের সময় বিজিবি’র গুলিতে নিহত হয়।
তার বুকের ডান পাশে গুলি লাগে। তিনি বলেন, আমার দুইটা ছেলে, তার মধ্যে তাকে নিয়েই আমরা বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশের জন্য, এলাকার জন্য, দ্বীনি শিক্ষার জন্য আমার এই ছেলেটাই বড় একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নূরুজ্জামান আরও বলেন, ২০০৫ সালের ১২ই নভেম্বর শিফাতের জন্ম। বয়সে ছোট হলেও শিফাতের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। করোনার সময় শিফাত আমাকে বলে- আব্বা আমার স্বপ্ন একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পদ আমি বিক্রি করে একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করি। প্রথমে নিজের বাড়িতে শুরু করি। বাড়িতে ৬ মাস চালানোর পর জমিজমা বিক্রি করে ১৮ শতাংশ জায়গা কিনে মাদ্রাসাটি শুরু করি। মাদ্রাসাটির নাম তালিমুল কোরআন হুসাইনীয়া মাদ্রাসা। শিফাতকে হারানোর পর থেকে আমি ও তার আম্মার কোনো কিছু মনে থাকে না। এখন আর কোনো কাজের স্পৃহা নেই।
যখন মাদ্রাসার ছাত্রদের পড়াই তখন একটু ভালো লাগে। মাওলানা নূরুজ্জামান বলেন, আমাদের এলাকার বেশির ভাগ লোক আওয়ামী লীগ। আমার ঘরের পাশে, বাড়ির পাশে, এলাকার লোকজন আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টের সঙ্গে ছিল, এখানে আওয়ামী লীগের প্রভাবটাই বেশি। আমাদের পরিবারটাই শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধিতায় ছিলাম সবসময়। আমি আওয়ামী লীগ না থাকার কারণে বংশের মানুষই অনেক সময় আমাকে সহযোগিতা করেনি, আমাদের পাশে থাকেনি। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে, এখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতারা বা আমার বংশের কেউ কোনোদিন ছেলের কবরটা জিয়ারত করতে আসেনি। কারণ তাদের ভেতরে আওয়ামী লীগের যে ক্ষোভ, এটা তাদের ভেতরে এখনো রয়ে গেছে। আল্লাহতায়ালা যেন আমার ছেলের রক্ত দেশের জন্য, দ্বীনের জন্য কবুল করেন- এই ফরিয়াদই জানাই।–মানব জমিন