ঢাকা থেকে রুহুল আমীন নগরী, সিলেট রিপোর্ট: বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমন, কওমি সনদের স্বীকৃতি অনুযায়ী চাকরিতে সুযোগ সৃষ্টি এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারসহ ১০ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের হলরুমে অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শুরা অধিবেশন-২০২৬-এ এসব প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদদীন যাকারিয়ার পরিচালনায় এই শুরা অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনে উপস্থাপিত প্রস্তাবাবলিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হলেও জনজীবনে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও দ্রব্যমূল্যে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এ সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
প্রস্তাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর বাজারদর নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে সিন্ডিকেট ও স্বার্থান্বেষী মহলের দাপট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল, ব্যবসা, সেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের দাবি জানানো হয়। নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সারা দেশে গায়ের জোরে নির্বাচনের কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী ও পক্ষপাতীত্বের নানা অভিযোগ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ ও অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কওমি সনদের স্বীকৃতির বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রস্তাবে বলা হয়, কওমি দাওরায়ে হাদিস তথা মাস্টার্স সমমানের সনদধারী আলেমদের সরকারি প্রাথমিক ও দাখিল স্তরের কারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কামিলস্তর পর্যন্ত আলিয়া মাদরাসা ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য সেক্টরে সম্মানজনক পদে কওমি শিক্ষার্থীদের নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া সরকারি তহবিল থেকে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তালিকাভুক্তির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ইনসাফভিত্তিক ভাতা বণ্টনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মুসলিম জাতিসত্তা-সংস্কৃতি ধ্বংসের জন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে সরকারকে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্যোগের নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামের পবিত্রতা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে মুসলিমনিন্দাকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জমিয়ত সভাপতির লিখিত ভাষণ:
নাহমাদুহু ওয়ানু সল্লি আলা রসুলিহিল কারিম আম্মাবাদ
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মজলিসে শূরার এই অধিবেশনে উপস্থিত সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, হাজরাতে ওলামায়ে কেরাম ও সাংবাদিক ভাইয়েরা!
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ তাআলার দরবারে অগণিত শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি আমাদেরকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আজকের মজলিশে শুরার অধিবেশনে হাজির থাকার তৌফিক দান করেছেন। দরুদ ও সালাম পেশ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।
ইসলামী রাজনীতির বুনিয়াদি সংগঠন ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’-এর নীতি নির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এই অধিবেশন সময়ের চাহিদা বিবেচনায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে এই মজলিসে আগত জমিয়তের নিবেদিত প্রাণ নেতৃবৃন্দকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্মরণ করছি আমাদের আকাবিরে দেওবন্দ ও জমিয়তের পূর্বপুরুষ সকল উলামা-মাশায়েখকে, যাদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি এবং দ্বীনী কাজ করার পরিবেশ পেয়েছি।
সম্মানিত সদস্যবৃন্দ!
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম কোনো আবেগসর্বস্ব বা সাময়িক ইস্যুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল নয়; এটি ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দ্বীনি ঐতিহ্যে শিকড় গেড়ে থাকা এক ধারাবাহিক মেহনত-মুজাহাদা ও আন্দোলন- সংগ্রামের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদা পূরণে মানবজমিনে যুগ যুগ ধরে অবদান রেখে আসা আকাবিরের ফিকরি আমানত।
জমিয়তের চিন্তাধারা সংরক্ষণপূর্বক আগামী প্রজন্ম পর্যন্ত সফলভাবে পৌঁছে দেওয়া এখন আমাদের উপর অর্পিত এক মহা গুরু দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের উপর নির্ভর করছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর আকিদা বিশ্বাস চিন্তা চেতনা ও ধ্যান-ধারণা টিকে থাকা না থাকার প্রশ্ন। আমরা যদি আমাদের এই পরিচয় মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে আগে না বাড়ি, তাহলে ওয়ারিসে নবীর জিম্মাদারী আদায়ে বড় রকম ত্রুটি সৃষ্টি হয়ে যাবে বলে মনে করি এবং আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বলে আশঙ্কা করি। তাই আমরা যতদিন বেঁচে থাকব আকাবির ও আসলাফের এই ঝান্ডা সমুন্নত রাখব ইনশাআল্লাহ।
মুহতারাম উপস্থিতি!
বাদশাহ আকবরের দীন বিরোধী ইলহাদ ও নাস্তিকতার বিরুদ্ধে সৈয়দ আহমদ সেরহিন্দি মুজাদ্দিদে আলফেসানী যেভাবে কাজ করেছেন, মুসনাদুল হিন্দ হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী যেভাবে দার্শনিক ভাষায় ইসলামকে তুলে ধরেছেন এবং মারাঠাদের হিন্দুত্ববাদ মোকাবেলা করেছেন, হযরত শাহ আব্দুল আজিজ দেহলবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যেভাবে হিন্দুস্তানের হুকুম নির্ধারণ করে কর্মপন্থা নির্দেশ করেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় সৈয়দ আহমদ রায়বেরলবি ও শাহ ইসমাইল শহীদ যেভাবে জিহাদের ময়দানে কোরবানি দিয়েছেন, হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি, হযরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী এবং হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত কাসেম নানুতবী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আজাদীর লড়াই সংগ্রাম যেভাবে করেছেন,
শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্দি প্রমুখ যেভাবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সোনালী ইতিহাস গড়ে তুলেছেন, শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ দেহলবী, হযরত আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী-এর মতো মহান মনীষীগণ যেভাবে শান্তিপূর্ণ রাজনীতির মাধ্যমে এ জাতিকে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করেছেন এবং গণরাজনীতির সমৃদ্ধ ইতিহাস রচনা করেছেন, তার সবই জমিয়তে উলামার চিন্তা-দর্শনের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই ধারাবাহিকতায় অতীতে আমাদের বাংলাদেশের আকাবিরে জমিয়ত যারা গত হয়েছেন, এখনো যে সকল মুরুব্বী হায়াতে আছেন, আজকের শূরার অধিবেশনে আমরা সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
সম্মানিত হাজেরিন!
আমাদের পথচলার মূল ভিত্তি হলো—আসলাফ ও আকাবিরের অনুসৃত আহলে সুন্নাতের আকীদা, আদর্শ ও কর্ম পন্থা। আমরা দীনের সঠিক ধারণার সাথে রাজনীতির সঠিক ধারণার সমন্বয় ঘটাতে চাই। দ্বীনি প্রজ্ঞার সাথে সাথে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সচেতনতা সৃষ্টি করা আমাদের বড় লক্ষ্য। এই দেশের মানুষ যেন ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে, মানুষ যেন চিন্তাধারাগতভাবে দিশাহীন না হয়, মানুষের চারিত্রিক শৃঙ্খলা যেন অটুট থাকে, মানুষের আধ্যাত্বিক জীবন যেন সঠিক পথে প্রবাহিত হয়, এই জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ যেন উজ্জ্বল হয়, এটা জমিয়তের অন্যতম লক্ষ্য।
মুহতারাম হাজেরিন!
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের রাজনৈতিক চিন্তাধারার সংগঠন। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতি দ্বীন-ইসলাম থেকে পৃথক কোনো বিষয় নয়; বরং ন্যায়বিচার, সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত সুন্নত-শরীয়তই একমাত্র মুক্তির দিশারী। তাই বাতিল, গোমরাহী এবং ঈমান-আকীদাবিরোধী যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে জমিয়ত সর্বদা আপসহীন।
প্রিয় উপস্থিতি,
অতীত ইতিহাস আমাদেরকে এই বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ৪৭ এ এই দেশে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ। তেমনি অনিবার্য বাস্তবতায় ৭১ এ বাংলাদেশী মানুষের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের স্বপক্ষে ভূমিকা রেখেছে জমিয়ত। একই ধারাবাহিকতায় ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানেও এই জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে জমিয়ত।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনসংস্থাপনের দাবি, এই দেশকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ঘোষণার যুগান্তকারী দাবি, বাংলাদেশের জাতিসংঘের কান্ট্রি অফিস খোলার প্রতিবাদ, কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার আন্দোলন, কওমি মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রক্ষায় জমিয়তের অবদান এবং বিগত ইলেকশনে জমিয়তের পদক্ষেপ ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
সম্মানিত আহলে শুরা!
বর্তমানে দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের মৌলিক অধিকার আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান সংকট ও বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতায় জর্জরিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার:
১.জমিয়ত কারো অন্ধ অনুসারী নয়, আবার কেবল বিরোধিতার জন্য অন্ধ বিরোধীও নয়। আমরা সততা ও ইনসাফের নীতিতে বিশ্বাসী। সরকারের যেসব উদ্যোগ ইসলাম, দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে, আমরা সেগুলোকে স্বাগত জানাব, কিন্তু যখনই কারো কোনো প্রকার পদক্ষেপে দ্বীনি ভাবগাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ হয়, জনগণের ওপর অত্যাচার চালোনো হয়, দুর্নীতি ও দুঃশাসন প্রশ্রয় পায় বা সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে—তখন জমিয়ত তার অতীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দেশের জনগনকে নিয়ে রাজপথে সোচ্চার ও সক্রিয় থাকবে ইনশাআল্লাহ।
2. বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই—দ্বিচারিতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও পরশ্রীকাতরতা পরিহার করুন। ইসলাম, মুসলমান ও জাতীয় ঐক্য, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের অধিকার আদায়ের ইস্যুতে সুস্থ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। জমিয়ত কখনো কোনো অন্যায় বা দেশবিরোধী এজেন্ডার অংশীদার হবে না।
3. ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন’ নীতির পক্ষে অবস্থান নেয় জমিয়ত। কোনো সাম্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে বাংলাদেশ নতজানু হতে পারে না।
4. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও উইঘুর আরাকানসহ বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক কণ্ঠস্বর আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করার জোর দাবি জানায় জমিয়ত।
5. ইরানে আমেরিকার সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানায় জমিয়ত। অপরদিকে ইরান সমর্থিত বিভিন্ন প্রক্সি কর্তৃক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ভূমিতে আগ্রাসী মনোভাবেরও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় জমিয়ত। বিশেষত হারামাইন শরীফাইনের প্রতি তাদের দূরভিসন্ধিকে চরম ধৃষ্টতা বলে মনে করে।
7. ভাতৃপ্রতিম সমমনা ইসলামী দল গুলোর সাথে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে জমিয়ত বরাবরের মত সর্বাগ্রে প্রস্তুত।
প্রিয় ভাইয়েরা!
রাজনীতি জনগনের কল্যাণের জন্য, তাই জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। আগামীর দিনগুলোতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে আরো গতিশীল, সুসংগঠিত ও আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেমন,
1. জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত জমিয়তের সাংগঠনিক ভিত আরো শক্তিশালী করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্রদেরকে সুনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় দ্বীনি রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
2. কেবল রাজনীতির ময়দানে নয়, বন্যা, মহামারী ও সামাজিক সংকটে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জমিয়তের দাওয়াতি ও সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্টি প্রতিটি ইস্যুতে আমাদেরকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
3. দেশের সর্বস্তরের উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে দ্বীনি স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
4. তরুণ সমাজকে দ্বীনি অনুশাসন ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে একটি বিশ্বস্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
5. যে কোন চরমপন্থা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক আত্মঘাতী কার্যক্রমের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং দেশ ও জাতিকে এ জাতীয় কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করতে হবে।
6. ইসলামের শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের মূল শিক্ষা তুলে ধরতে হবে।
7. আমাদের মাদ্রাসাগুলো সমস্ত দ্বীনি কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার। আজ সেই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র চলছে , এ সব ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় দেশবাসীকে নিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে ।
8. দেশের মানুষকে বস্তুবাদ থেকে রক্ষা করা এবং উগ্রবাদ থেকে ফিরিয়ে রাখার একটি বড় জিম্মাদারী আরোপ হয় জমিয়তের উপর। তাই আকাবিরের রেখে যাওয়া শান্তিপূর্ণ কর্ম পন্থার উপর অবিচল থেকে আমাদেরকে সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে।
সম্মানিত সদস্যবৃন্দ!
আসুন, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত মনস্তাপ, সুপ্ত ভেদাভেদ এবং সংকীর্ণতা ভুলে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দ্বীন ও মিল্লাতের খেদমতে নিজেদের উৎসর্গ করি। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে উম্মাহর পথপ্রদর্শক হিসেবে আমাদের ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখি। ঈমানি বলে বলীয়ান হয়ে, হিকমত ও সাহসিকতার সাথে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর নেজাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
সেজন্য আমি আরো প্রস্তাব রাখতে চাই,
1. আমাদের কওমি দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলোর ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করার লক্ষ্যে তালিমের সাথে সাথে আখলাক ও তরবিয়তের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করা হোক।
2. মাদ্রাসা এলাকায় জনমানুষের খেদমত বিশেষত ফরজে আইন পরিমাণ শিক্ষার আওতায় সর্ব বয়সি মানুষকে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
3. দলের মাঝে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা এবং জমিয়ত সাহিত্য সম্ভার গড়ে তোলা সময়ের অন্যতম দাবি।
4. রাজনৈতিক অধিকার কারো অনুগ্রহের দান হিসেবে আসে না, এটা যোগ্যতা এবং প্রচেষ্টা বলে আদায় করে নিতে হয়। তাই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাংগঠনিক মজবুতি ও বিস্তৃতি বৃদ্ধি করার কোন বিকল্প নেই।
5. আমরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান সকল ধর্ম-বর্ণ এবং ফেরকার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সরকার গঠনে বিভিন্ন নির্বাচনে আন্দোলনে জোট করার ক্ষেত্রে আমরা কওমি মাদ্রাসার স্বার্থ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের স্বকীয়তা রক্ষার গুরুত্ব ইত্যাদি উপেক্ষা করতে পারবো না।
6.আমরা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে প্রধানত ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত ভূমি হিসেবে প্রাপ্ত রাষ্ট্র বলে বিশ্বাস করি এবং তাকে প্রকৃত অর্থে ইসলামী রাষ্ট্রের নমুনা বানাতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছি। তাই আমরা বাংলাদেশে সেকুলারিজম নয় বরং ইসলামী মূল্যবোধ চর্চা, ইসলামী শরীয়ত জারির ক্ষেত্রে অগ্রসরতা কামনা করি।
7. বাংলাদেশের আকাবির ওলামায়ে কেরামকে জাতির সামনে তুলে ধরা এবং তাদের মতামত থেকে জাতিকে উপকৃত হওয়ার মতো প্লাটফর্ম রেডি করে দেওয়া জমিয়তের অন্যতম দায়িত্ব। তাই ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক গভীর করার কোন বিকল্প নেই
8. ইসলামের উপর অযাচিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় সন্দেহের জবাব যুগের ভাষায় সাবলীল ভাবে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা জমিয়তে ওলামার দায়িত্ব বলে মনে করি। বিশেষত নাস্তিকতার ফেতনা মোকাবেলায় দলিল সমৃদ্ধ লিটারেচার উপহার দেওয়া জমিয়তের বিশেষ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
9. বর্তমানের একটি বড় ফিতনা মওদুদীবাদ। এটা একদিকে যেমন উগ্রবাদী চরমপন্থী ধ্যান ধারণার আখড়া, অন্যদিকে শিয়াবাদ, লিবারেলিজম ইত্যাদিরও ভয়াবহ মিশ্রণ তাতে লক্ষণীয়। বর্তমানে এরা উলামায়ে দেওবন্দের আইডেন্টিটি নস্যাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বিভিন্ন মসজিদে চাকরিচ্যুতি ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা লাভের ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছে ওলামায়ে দেওবন্দ। এ ব্যাপারে নিজ অঙ্গন ও দেশবাসীকে সচেতন করা সময়ের অন্যতম দাবি।
10. মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে শালীনতার সীমালঙ্ঘন এবং বিভিন্ন দলকে বৈচিত্র্য হিসেবে গ্রহণ না করে ঘৃণা সংঘাতের হাতিয়ার বানিয়ে নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
11. বিভিন্ন পেশাজীবী, পরিবহন ও গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সবার অধিকার ও দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি আমাদের কর্তব্য।
12. নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্নেহ প্রদর্শন এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখা জমিয়তের অন্যতম লক্ষ।
মুহতারাম হাজেরিন!
দীন দেশ ও জাতির কোন প্রয়োজন পূরণে জমিয়ত কখনোই পিছিয়ে থাকেনি, থাকবে না ইনশাআল্লাহ। জমিয়তের দাওয়াত ও পয়গাম দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি সৌহার্দ্য বজায় রাখাই আজকের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এই শূরা বৈঠককে কবুল করুন, সিদ্ধান্তগুলোতে বরকত দান করুন এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ইসলাম ও দেশের খেদমতে কবুল করুন। আমিন।
ওয়া আখিরু দাওয়ানা আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
আরজ গুজার
মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক
সভাপতি,
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ
রোজ শনিবার,
৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং
২২ রবিউস সানি ১৪৪৮হি.
ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট হল রুম
রমনা ঢাকা।