
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় এক যুবলীগ নেতার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পৃথক হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার( ২৫ মার্চ) দুপুরে উপজেলার উত্তর গোয়ালাবাজারে শাহপরান ট্রেডার্স ও বিকালে গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের এওলাতৈল গ্রামে যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। হামলায় যুবলীগ নেতার পরিবারের ৬সদস্য ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারীসহ মোট ৮জন আহত হয়েছে।
এসময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘরে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান সমাগ্রী ভাংচুর ও নগদ টাকা এবং স্বার্ণালঙ্কার লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার পরিবারের সদস্যরা । এতে করে ওই পরিবারের নগদ অর্থ ও মূল্যবান মালামালসহ প্রায় ৮ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বুধবার বিকালে শাহ মো. শাকিল মিয়ার বাড়িতে মুখোশ পরিহিত ১০/১২ জনের সংঘবদ্ধ বাহিনী পূর্ব পরিকল্পিত হামলা চালায়। দুর্বৃত্তদের হামলা ভাংচুরে ও আহতদের আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন স্থানীয়রা। এই ঘটনায় যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার ভাই গোয়ালাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান ও বর্তমান ইউপি সদস্য শাহ আলমগীর এবং তার ভাই শাহ জাহাঙ্গির আলম, বৃদ্ধা মা জায়েদা খাতুনসহ আরো তিনজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এর আগে একই দিন সকালে যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার ভাইয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উত্তর গোয়ালাবাজারে বাতির ম্যাশনের শাহপরান ট্রেডার্স এ পৃথক হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এসময় দোকান কর্মচারী রুপু মিয়া ও জুবায়ের আহমদ আবু গুরুতর আহত হন।
আহত রুপু মিয়া বলেন, প্রতিদিনের মতো আমরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে মালামাল ঠিক করছিলাম হঠাৎ তিনটি মোটরসাইকেলে ৬/৭ জন ব্যক্তি আমাদের দোকানে হামলা চালায়। এসময় তারা বলে শাকিল যুবলীগ করে এখন তার বাহাদুরী নেই, সে আত্মগোপনে তাই এই প্রতিষ্ঠানও আমাদের এই বলে তারা ক্যাশ বাক্সে থাকা দোকানের প্রায় ৪৬ হাজার ৩শ টাকা নগদ ও কিছু গাড়ির পার্টস তাদের সাথে নিয়ে যায়। তাদের বাধা দিলে ছুরি দিয়ে আমার ও জুবায়ের হাতে ঘা দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে আমরা ভিতর থেকে দোকানের শাটার লাগিয়ে দেই, আমাদের আশপাশের দোকানের লোকজন বাধা দিতে এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি ভাবে দোকানের শাটারে বাড়িদেয় এবং লোকজনদের উপর ইট-পাটকেল দিয়ে আঘাত করে তারা চলে যায়।
জানা গেছে, গোয়ালাবাজার ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন শাহ মো. শাকিল মিয়া। ওসমানীনগর থানার সাবেক ওসি হত্যা মামলা ও বিএনপির নেত্রীর গাড়িতে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত তিনি । আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে শাহ মো. শাকিল মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন। এরই জের ধরে ধাবে ধাপে তার বাড়িতে ও তার ভাইয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে আতঙ্কে দিন পার করছেন তার পরিবারের সদস্যরা। হামলার ঘটনায় ক্লোজড-সার্কিট টেলিভিশন (সিসি ক্যামেরা)ভিডিও ফুটেজসহ থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলেও তা গ্রহন করছেন না পুলিশ। এতেকরে ফের হামলার শঙ্কায় দিন পার করছেন আহতরা।
এই বিষয়ে যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়া বড় ভাই ইউপি সদস্য শাহ আলমগীর বলেন, বিকালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করার সময় এক দল সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমাদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই ধারালো দা দিয়ে আমার হাতে কোপ দেয়। এবং আমার পায়ে হকিস্টিক দিয়ে আঘাত করে । হকিস্টিকের আঘাতে আমার পায়ের হাড় ভেঙে যায়। আমাকে বাঁচাতে আমার ভাই ও মা এগিয়ে এলে তাদেরও এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। এসময় ঘরে ঢুকে আলমারির তালা ভেঙ্গে নগদ টাকা স্বর্ণালঙ্কারসহ দামী জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় তারা। এই বিষয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও তা গ্রহন করছে না পুলিশ। তাই আমরা ফের হামলার শঙ্কায় নিরাপত্তাহীনতায় দিন পার করছি।
এদিকে, গত বছরের ২৮ নভেম্বর একই কায়দায় যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয় বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সহযোগী সংগঠন যুবলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের এওলাতৈল গ্রামের শাহ মো: রফিক মিয়ার পুত্র শাহ মো. শাকিল মিয়া। ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর বিকালে গোয়ালাবাজারের দাশপাড়া রোডের মুখে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী ও বর্তমানে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনার গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আদালতে সি আর ৩০২/২৪ ও বিশেষ ক্ষমতা ৫৬/ ২৫ দুটি মামলা দায়ের করেন ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মন্নান বক্স। মামলায় রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ও যুবলীগের কার্যক্রম নিষ্কৃয় করতে উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে ঢালাওভাবে ভাবে আওয়ামী লীগ যুবলীগসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আসামি করা হয় বলে অভিযোগ শাহ মো. শাকিল মিয়ার পরিবারের। মামলায় ১০ নাম্বার আসামী করা হয়েছে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. শাকিল মিয়াকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর পাল্টেযায় দৃশ্যপট। সেই মামলার আসামীদের খুঁজে-খুঁজে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মন্নান বক্স, বিএনপি নেতা সেলিম খান, উপজেলা বিএনপি নেতা ইসলাম উদ্দিনের ইন্ধনে প্রায় ২৫/৩০ জন ছাত্রদল যুবদলের যুবক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়ার বাড়িতে পূর্বেও হামলা চালায়। এই ঘটনায় প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করছেন যুবলীগ নেতার পরিবার।
ওসমানীনগর থানার সাবেক অফিসার ইনচার্য মোস্তাফিজুর রহমান হত্যা মামলা দায়রা ৫৬৩/২০১৯ এর ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামী এবং বিএনপি নেত্রী লুনার গাড়ি ভাংচুর ৩০২/২৪ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী থাকায় যুবলীগ নেতা শাহ মো. শাকিল মিয়াকে গ্রেপ্তারে কড়া বার্তা দিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এই বিষয়ে ওসমানীনগর থানার ওসি মুর্শেদুল আলম ভূইয়া বলেন, হামলার ঘটনায় অভিযোগ দিলে তা গ্রহন করা হবে। এ ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় জরিত। তাই প্রথমে পুলিশ তদন্ত করছে। যদি অভিযোগ গ্রহনের মতো হয়, তাহলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।