সিলেট রিপোর্ট:
আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী (পীর সাহেব বরুণা) বলেছেন, আত্মশুদ্ধির মেহনত ব্যতীত সমাজ সংস্কার অসম্ভব। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ গোলামি সম্ভব। সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যেই গোনাহ করতেন, ইসলাম গ্রহণের পর আত্মশুদ্ধির মেহনত করে তারাই হয়ে গেলেন সোনার মানুষ। বর্তমানে সমাজে যত অনাচার, হত্যা, দুর্নীতি ও অরাজকতা রয়েছে আত্মশুদ্ধির মেহনতের মাধ্যমে সব বন্ধ হয়ে যাবে।
অরাজনৈতিক ইসলাহী সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ৮২ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আজিমুশশান ইসলাহী ইজতেমার উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার বাদ ফজর থেকে শুরু হওয়া ইজতেমায় আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এলজিবিটিকিউ এবং ট্রান্সজেন্ডারকে বিভিন্নভাবে প্রমোট করা হচ্ছে। এই অভিশপ্ত ঘৃণ্য কাজ সমাজে ছড়িয়ে দিতে নানাবিধ চক্রান্ত চলছে। যেকোনো মূল্যে এসব রুখে দিতে হবে।
পীর সাহেব বরুণা আরও বলেন, নব্বই ভাগ মুসলমানের এই দেশে মুসলমানের সন্তানদের ঈমান-আমলের হেফাজতের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাথমিক স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সঠিক দায়িত্ব পালন না করলে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের সন্তানদের ফরজে আইন পরিমাণ দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করা।
ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পীর সাহেব বরুণার ভক্ত-মুরিদানরা বাস-ট্রেন ভর্তি করে বৃহস্পতিবার রাতেই ফজরের আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছান। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও রোনাজারির আমলে শরিক হতে মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নামে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পীর সাহেব বরুণার ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয় বৃহৎ জুমার জামাত। লক্ষাধিক মুসল্লি এতে অংশগ্রহণ করেন।
আঞ্জুমানের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শেখ সাদ আহমদ আমীন বর্ণভী, মুফতি ওয়াজেদ আলী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফীর সঞ্চালনায় ইতিমধ্যেই বয়ান করেছেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা আকরাম আলী ফরিদপুরী, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী প্রমুখ।
রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইসলাহী ইজতিমায় বাদ জুমআ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুসা আল হাফিজ।
আলোচনায় তিনি মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, রূহানী চিকিৎসা, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বীনি শিক্ষা, ফরজ ইলম অর্জন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
রূহানী চিকিৎসার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইমাম কুশাইরি (রহ.), ইমাম গাযালী (রহ.) ও ইমাম হুজবেরী (রহ.)-এর রচনার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও রূহানী চিকিৎসার যে জ্ঞানধারা বিকশিত হয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ও হজরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর মাধ্যমে ধারাবাহিকতা লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি শায়খে বরুণী হাফিজাহুল্লাহ রচিত ‘আত্মার দশ রোগ ও তার প্রতিষেধক’ গ্রন্থের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও মসজিদভিত্তিক দ্বীনি তালিমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বীনি শিক্ষা যেন শুধু ফাজায়েল বা ফজিলতসংক্রান্ত আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মাসায়েল শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে কেবল কিতাবনির্ভর না হয়ে উলামানির্ভর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি সহিহ বুখারির হাদিসের আলোকে বলেন, দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে আলেমদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা বিভিন্ন অনলাইন লেকচারকে দ্বীন বোঝার মূল উৎস বা একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেন।
দেশের দ্বীনি শিক্ষার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে উস্তায মুসা আল হাফিজ বলেন, বাংলাদেশে সরাসরি দ্বীনি শিক্ষার আওতায় রয়েছে মাত্র চার শতাংশ মানুষ। বাকি বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বীনি জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে।
ইজতেমায় দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা ও সুধীজনের পাশাপাশি সারাদেশ থেকে লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম হয়।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেমগণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করা, আত্মশুদ্ধির প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করার আহবান জানিয়ে বয়ান পেশ করেন।