রুহুল আমীন নগরী/ রশীদ আহমদ, সিলেট রিপোর্ট প্রতিনিধি-জাতিসংঘ অধিবেশন:
কয়েক মাস আগে যে ঐতিহাসিক নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন, আজ সেই দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে খোদ জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথেই বসলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে আজ নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
এই দায়িত্বটা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গত ২ জুন সাইপ্রাসের প্রার্থীকে ৯৯ ভোটে হারিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান—১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর এই সম্মান পাওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি তিনি। এই দায়িত্ব শুধু বৈঠকের সভাপতিত্ব করাতেই সীমাবদ্ধ নয়—বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সচল রাখাও তার দায়িত্বের অংশ।
এই মেয়াদে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা কী হতে পারে?
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, খলিলুর রহমানের এই এক বছরের মেয়াদকালেই (সেপ্টেম্বর ২০২৬-২০২৭) অনুষ্ঠিত হচ্চে পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া, কারণ বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী আন্তর্জাতিক পদের একটির নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্ব এখন সরাসরি একজন বাংলাদেশির হাতে।
এই কূটনৈতিক মর্যাদার তাৎপর্য কী?
একদিকে বাংলাদেশ চীন-যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সাথে ভারসাম্যের কূটনীতি করছে, অন্যদিকে জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা পদে বসাটা দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি কার্যকরভাবে এই কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে, তাহলে এই সুযোগ ভবিষ্যতে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও প্রভাব বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. খলিলুর রহমান:
বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি
ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় তাঁর রয়েছে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
ড. খলিলুর রহমান অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই সময়ে তিনি দেশের প্রথম নিয়মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন করেন। তিনি Tufts University-এর Fletcher School of Law and Diplomacy এবং Harvard University-এর Kennedy School of Government-এ পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে তিনি MA in Law and Diplomacy এবং PhD in Economics ডিগ্রি অর্জন করেন।
কূটনৈতিক জীবনের সূচনা
ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেন। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী কর্মজীবনের সূচনা।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময়ে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের Economic and Financial Committee-তে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। পাশাপাশি তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।
জাতিসংঘে দীর্ঘ কর্মজীবন
১৯৯১ সালে ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন। জেনেভায় United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD)-এ তিনি Special Adviser হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। পরবর্তী প্রায় ২৫ বছর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল—
UNCTAD-এর Management Division-এর প্রধান
UNCTAD-এর Technology Division-এর প্রধান
UN Secretary-General-এর Executive Office-এ Economic, Social and Development Affairs-এর প্রধান
UN Secretary-General-এর High-Level Panel on the Technology Bank-এর Executive Secretary
UN Interagency Group on Non-Tariff Barriers-এর Chair
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে UNCTAD Bureau Chief
এসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গবেষণা ও প্রকাশনা
ড. খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছেন। তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বা flagship publication-এর প্রধান লেখক ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী ছিলেন। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব ও UNCTAD-এর মহাসচিবের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও তিনি অবদান রাখেন।
তাঁর পেশাগত কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নীতি এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা।
পূর্ব-পশ্চিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
ড. খলিলুর রহমান ঢাকার East West University-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির Board of Trustees-এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নভেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর এই ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রোহিঙ্গা সংকটে দায়িত্ব
নভেম্বর ২০২৪ সালে ড. খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টায় সরাসরি যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংকটটির দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বহুপাক্ষিক কূটনীতির গুরুত্ব তাঁর দায়িত্বের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক ও জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি
ড. খলিলুর রহমানের কর্মজীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক অর্জন হলো ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন; প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট।
জাতিসংঘের সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তিনি ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অধিবেশনটি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হয়েছে।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশের একজন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন—যা বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সভাপতিত্বের মূল অগ্রাধিকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের জন্য ড. খলিলুর রহমানের ঘোষিত মূল ভাবনা হলো—
“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”
অর্থাৎ, আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা তাঁর সভাপতিত্বের মূল ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে।
নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য তৈরি এবং গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন যে মতপার্থক্যকে উপেক্ষা না করেও অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।
পারিবারিক জীবন
ড. খলিলুর রহমান বিবাহিত। তাঁর দুই কন্যা ও চারজন নাতি-নাতনি রয়েছে।
কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক
১৯৭৭ — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম; প্রথম নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান।
১৯৭৯ — বাংলাদেশের কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগদান।
১৯৮০–১৯৮৩ — Fletcher School ও Harvard Kennedy School-এ উচ্চশিক্ষা।
১৯৮৩–১৯৯১ — পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব।
১৯৯১ — UNCTAD-এ যোগদান।
পরবর্তী ২৫ বছর — জাতিসংঘের নিউইয়র্ক ও জেনেভা কার্যালয়ে বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ দায়িত্ব।
নভেম্বর ২০২৪ — রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ; পরবর্তীতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ।
২ জুন ২০২৬ — জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত।
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু।
উপসংহার
ড. খলিলুর রহমানের কর্মজীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাদেশের কূটনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা এবং উন্নয়ননীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সমন্বয়। একজন কূটনীতিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব, রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত কর্মজীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানেরও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।