September 2, 2026, 11:40 am
Title :
সিলেট রিপোর্ট সম্পাদক মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরীর সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত নুরুল ইসলাম মাদ্রাসার উদ্যোগে সিরাত প্রতিযোগিতা ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ইফার বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য হলেন যে ৫ আলেম সিলেট ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নগরী- সিসিক প্রশাসক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে: ট্রাম্প ইসলামি গবেষণায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী’র জাতীয় পদক গ্লোবাল পিস অ্যাওয়ার্ড লাভ বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর ১০৮ তম জন্মবার্ষিকী পালিত ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জননেতা আব্দুল হামিদের ২৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালিত সাবেক যুগ্ম সচিব ও প্রথম বাঙ্গালী বৈমানিক আলী আশরফের ৩৬ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন

সিলেট হামলা: স্বাধীনতার পর মৌলবাদী বিস্তার ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

  • সিলেট রিপোর্ট ডেস্ক: প্রকাশিত হয়েছে— Thursday, December 14, 2017

বেলাল মনজু


২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে সিলেটে ঘটে যাওয়া আত্মঘাতী বিস্ফোরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মর্মস্পর্শী মুহূর্ত। র‌্যাব সদর দপ্তরের সামনে এই হামলায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ সাতজন নিহত হন, আহত হয়েছিলেন ৪৫-এর বেশি। এটি দেশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে প্রথমবারের মতো আত্মঘাতী হামলায় এত বেশি প্রাণহানির ঘটনা।
হঠাৎ মনে হতে পারে, “জঙ্গিবাদ কি নতুন?” কিন্তু বাস্তবতা বলছে—না, এটি পুরনো। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি ক্রমবর্ধমান হয়েছে। তারা সংখ্যালঘু, নারী, মুক্তমনা ব্যক্তিত্ব এবং সমকালীন সমাজের মুক্তচিন্তা দমন করতে চায়। সিলেট হামলা শুধু মৃত্যু নয়; এটি সতর্কবার্তা যে আমাদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক চেতনা এখনও ঝুঁকির মধ্যে।
১৯৭১: যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী সহিংসতার ছায়া:
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়ক আল-বদর, আল-শামস এবং রাজাকাররা যে বর্বরতা চালিয়েছিল তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন। বুদ্ধিজীবী হত্যা, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হিংসা এবং নারীর ওপর যৌন নির্যাতন—এসব কেবল ব্যক্তিগত নয়, পুরো জাতির মুক্তি ও মানবিকতার প্রতি আঘাত।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আদর্শের জন্য হত্যা, সন্ত্রাস এবং নীরবতা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। স্বাধীনতার পরও সেই ছায়া আমাদের রাজনীতিতে লুকিয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর মৌলবাদী শক্তির পুনর্গঠন:
১৯৭৫-এর পর জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা, মৌলবাদী শক্তির পুনর্জাগরণের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছে। জামায়াতের ছাত্রশিবির, হেফাজত, হিজবুত তাহরীর এবং Ansarullah Bangla Team-এর মতো সংগঠনরা সক্রিয়ভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে।
এসব সংগঠন শুধুমাত্র রাজনৈতিক শক্তি নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী। তারা নারী, সংখ্যালঘু ও মুক্তমনা ব্যক্তির অধিকার সীমিত করতে চায়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই বিস্তার এত দ্রুত সম্ভব হতো না।
হেফাজত, হিজবুত তাহরীর ও Ansarullah: তরুণ সমাজের লক্ষ্যবস্তু:
হেফাজত নিজেকে ধর্মীয় শিক্ষা ও আলেম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে তাদের কর্মসূচি প্রায়ই নারীর শিক্ষা, মুক্তচিন্তা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিরোধী। হিজবুত তাহরীর গোপন কর্মকাণ্ড তরুণদের মধ্যে খিলাফতভিত্তিক রাজনীতি প্রচার করে। Ansarullah Bangla Team ব্লগার, প্রকাশক ও শিক্ষক হত্যা করে আদর্শিক ভয় তৈরি করছে।
এই সব গোষ্ঠীর কার্যক্রম একটি বার্তা দেয়: রাষ্ট্র অজেয় নয়, কিন্তু রাজনৈতিক নীরবতা বা পৃষ্ঠপোষকতা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে।
মুক্তমনা হত্যার নীরবতা:
২০১৩-২০১৬ সালের মধ্যে ব্লগার, প্রকাশক এবং মুক্তচিন্তার ব্যক্তিত্ব হত্যাকাণ্ড সমাজকে স্তব্ধ করেছে। যারা যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে লিখতেন, তাদের হত্যা বা হুমকি দমনমূলক প্রভাব ফেলে।
মৌলবাদী শক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী হলে, এই হত্যাকাণ্ড সমগ্র সমাজকে সংকুচিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প-সংস্কৃতি ও অনলাইন মিডিয়ায় স্বাধীন চিন্তা দমন হয়।
সংখ্যালঘু ও নারীর নিরাপত্তা:
১৯৭১-এর সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়েছে। রাজনীতিতে মৌলবাদী ভাষ্য বা জোটের কারণে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রায়ই ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
নারীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। হেফাজত ও অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রায়ই নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়; প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকেও প্রভাবিত করে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও এর প্রভাব:
মৌলবাদী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বিএনপি এবং তাদের বিভিন্ন সময়ের নেতৃত্ব, বিশেষ করে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আমলে, কখনো কখনো এই শক্তির উত্থানে অব্যক্ত বা প্রকাশ্য সহায়তা প্রদান করেছে। রাজনৈতিক সুবিধা বা শক্তি অর্জনের জন্য এই শক্তি ব্যবহার হয়েছে।
এটি দেখায় যে জঙ্গিবাদ কেবল আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাস নয়; এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত। সিলেট হামলা তাই একক ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল।
সিলেট হামলার শিক্ষা:
সিলেট হামলা রাষ্ট্র ও সমাজকে সতর্ক করেছে। এটি দেখায় যে, জঙ্গিবাদ একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের ফল। তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করা, রাজনৈতিক নীরবতা এবং সামাজিক অসচেতনতা—এসব মিলিত হয়ে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বা সামরিক অভিযান দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আদর্শিক পুনর্বিন্যাস, মুক্তচিন্তার প্রসার, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার নিশ্চিত করা—এসবই জঙ্গিবাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধে অপরিহার্য।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
রাজনৈতিক নীরবতা, আদর্শিক আপস এবং ক্ষমতার জন্য মৌলবাদী সংগঠনের প্রতি নরম মনোভাব বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হবে, মানবাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, সংখ্যালঘু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেট হামলা থেমে গেছে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি এখনো ইতিহাস, রাজনীতি এবং সমাজের নানাপ্রান্তে শোনা যায়। চ্যালেঞ্জ শুধু নিরাপত্তার নয়; এটি আদর্শিক ও নৈতিক প্রতিরোধের। ১৯৭১-এর মানবিক ও বহুত্ববাদী চেতনাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ না করলে, ভবিষ্যত প্রজন্মও সেই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখতে পারবে না।

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট

শেয়ার করুন

আরো খবর
Theme Customized By BreakingNews