২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। ছাত্র-জনতার ঘোষিত এক দফার ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির সমর্থনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর একটি দিকনির্দেশনামূলক বার্তা শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলে সারা দেশ। ওই ঐতিহাসিক বার্তা প্রকাশের পরদিনই ঢাকামুখী রাজপথে নেমে আসে লাখো কওমি শিক্ষার্থীর বাঁধভাঙা ঢল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পুরো গতিপথই বদলে দিয়েছিল এই আন্দোলন মুখর মুহূর্ত।
নয়া মুক্তির লড়াই’ ও আমিরে হেফাজতের ডাক
‘ছাত্র-জনতার এক দফার ডাকে সবাই ঢাকা চলুন’—এই আহ্বানে দেওয়া বিবৃতিতে আল্লামা বাবুনগরী ঘোষণা করেন, ‘এটা আমাদের নয়া মুক্তির লড়াই। যারা আমাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করেছে, তাদের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের সময় এখনই।’
তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশবাসীকে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে রাজপথে নামার আহ্বান জানান তিনি। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের নির্মম স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ওই আগুন আজও আমাদের বুকে দাউদাউ করে জ্বলছে। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। এই জালিম শক্তিকে আর কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না, ন্যায়বিচার রক্ষায় আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে।’
বিবৃতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তোলে। ফলশ্রুতিতে, ৫ আগস্ট ভোর থেকেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে লাখো আলেম-ওলামা ও কওমি শিক্ষার্থীদের উত্তাল উপস্থিতি আন্দোলনকে রূপ দেয় এক মহাসমুদ্রে।
সেই চাপেই আত্মগোপনে যান ইসলামাবাদী’
ঘটনাবহুল এই দিনটিকে গণআন্দোলনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক ও চিন্তক পিনাকী ভট্টাচার্য। ফেসবুকে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘৪ আগস্ট হেফাজত আমীরের সেই ঐতিহাসিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পরদিন ভোরেই কওমি তরুণরা ঢাকায় নেমে আসে। আর এটাই ছিল শেখ হাসিনা শাসনের পতন ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়া মূল মুহূর্ত। আর সেই ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েই ইসলামাবাদী ভাইকে আত্মগোপনে যেতে হয়।’
রাজপথের নেপথ্য ও এক অবর্ণনীয় রাতের গল্প
ঐতিহাসিক সেই বিবৃতির মূল খসড়াকার ও হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী সেদিনের স্মৃতিচারণ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণদাবির প্রতি হেফাজতের অবস্থান স্পষ্ট করতেই আমি বার্তাটি প্রস্তুত করি। ৪ আগস্ট দুপুরে আমিরে হেফাজতের সম্মতিক্রমে এটি গণমাধ্যমে পাঠানো মাত্রই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রযন্ত্র আমাকে গ্রেপ্তারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।’
জীবনবাজি রেখে আত্মগোপনে যাওয়ার সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। এক ঘণ্টার বেশি কোথাও অবস্থান করা যাচ্ছিল না। অবশেষে ঢাকার এক কওমি মাদরাসায় আশ্রয় নিই। সেখানকার মুহতামিম ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের জান বাজি রেখে আমাকে পাহারা দিয়েছিল। মোবাইল এক জায়গায়, আমি আরেক জায়গায়—বাইরের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এক অবর্ণনীয় সময় কেটেছে।’
ঝুঁকি সত্ত্বেও ঐতিহাসিক আমানত সঠিক সময়ে জাতির সামনে তুলে ধরতে পারাকে জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হিসেবে দেখছেন এই আলেম নেতা। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি সময়মতো পালন করতে পেরেছিলাম। পরদিনই কওমি তরুণদের রাজপথ দখলের মাধ্যমে রচিত হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। বিজয়ের সেই ভোরে আল্লাহর দরবারে কোটি শুকরিয়া আদায় করি।’
হাসান আল মাহমুদ
সাব-এডিটর