আল্লামা রশীদুর রহমান শায়খে বরুণার ডাকে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক ইসলাহি সম্মেলন
আহ্বান এসেছে বরুণা থেকে। গন্তব্য ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
শতাব্দীর প্রাচীন দ্বীনি কাফেলা আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের ডাকে আল্লামা রশীদুর রহমান শায়খে বরুণী দা.বা. -এর আহ্বানে ৩০ অক্টোবর ২০২৬, রোজ শুক্রবার, ইতিহাসের সাক্ষী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক মহতী ইসলাহি সম্মেলন। আত্মশুদ্ধির সেই ময়দানে শরীক হতে সিলেট থেকে ছুটে চলেছে হাজারো আশেকে রাসূলের কাফেলা।
এই অধমও সেই কাফেলার একজন হয়ে যে সফর করেছে, তারই কারগুজারী পেশ করছি।
“যাত্রার প্রারম্ভ: মেজরটিলা থেকে টার্মিনাল”
২৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ঠিক ৩টা ৪০ মিনিট। শরতের সোনালী রোদ তখনও নিভে যায়নি। মেজরটিলা বাজার থেকে আমরা চারজন — মাওলানা এরশাদ খাঁন, মাওলানা আব্দুল্লাহ আল হাদী, মাওলানা রেজাউল হক এবং এই অধম — একটি সিএনজি যোগে রওয়ানা হলাম সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল মসজিদের দিকে।
মসজিদের আঙিনায় পা রাখতেই হৃদয়টা ভরে উঠল। এ যেন এক অন্য জগৎ। চারদিক থেকে সাদা পাঞ্জাবি, সাদা টুপি পরিহিত হাজারো ওলামায়ে কেরাম এবং শায়খে বরুণী দা.বা. এর মুরিদ ও মুহিব্বীনগণ ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছেন। সবার চোখে একই ভাষা, মুখে একই জিকির — উদ্দেশ্য একটাই, গন্তব্য একটাই — ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত শুধু মানুষ আসছেই। টার্মিনাল মসজিদ তখন জনসমুদ্রে পরিণত।
বাদ মাগরিব, মসজিদের মিম্বর থেকে সফরের আদব, জিকির-আজকারের ফজিলত এবং সুশৃঙ্খলভাবে গন্তব্যে পৌঁছার তারগীব পেশ করা হলো। হৃদয় বিগলিত করা নসীহত শেষে শায়খে বুরুঙ্গা রহ. এর বড় সাহেবজাদা শায়খ আব্দুর রহমান সাহেবের মোনাজাতের মাধ্যমে কাফেলা রওয়ানার প্রস্তুতি নিল।
“সারি সারি গাড়ি, এক অভিন্ন কাফেলা”
দোয়া শেষে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে সিরিয়ালে। আমাদের বাসের নম্বর ৭। আমরা সিটে গিয়ে বসলাম। এই গাড়ির জিম্মাদার হিসেবে ছিলেন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, সিলেট মহানগর ৩৫ নং ওয়ার্ডের সংগ্রামী সেক্রেটারি মাওলানা এরশাদ খাঁন সাহেব। ৪০ সিটের পুরো বাসটিই ৩৫ নং ওয়ার্ডের সাথীদের দ্বারা পরিপূর্ণ। এ ওয়ার্ড থেকে কেউ বিমানে, কেউ প্রাইভেট গাড়িতে করেও এই মোবারক মাহফিলে শরীক হয়েছেন আরো অনেকে।
সন্ধ্যা ৬টার পর আমাদের গাড়ি আল্লাহর নাম নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল। জানালার বাইরে শ্যামল সিলেটকে পেছনে ফেলে কাফেলা এগিয়ে চলছে ইসলাহের পানে।
“শেরপুরে এক খণ্ড নূরের গল্প”
রাত গভীর হচ্ছে। এশার নামাজের জন্য শেরপুরে আমাদের বাস বিরতি দিল। আমরা সবাই মসজিদে গিয়ে দেখি এক করুণ দৃশ্য — অজুখানা ও বাথরুমে তালা ঝুলছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তালা খোলার কোনো ব্যবস্থা হলো না। আমরা পেরেশান হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
এমন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে যেন এক ফেরেশতা এলো। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরা এক যুবক আমাদের পেরেশানি দেখে এগিয়ে এলো। বিনয়ের সাথে বলল, “আমার সাথে আসেন, গাঙ্গের পারে আরেকটা মসজিদ আছে, সেখানে নামাজ পড়তে পারবেন।”
সেই যুবক দৌড়ে গিয়ে ইমাম সাহেবের কাছ থেকে চাবি এনে আমাদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিল। আহ! কী আখলাক! পোশাকে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও তার হৃদয়ে ছিল দ্বীনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা এই যুবককে দ্বীনের খাদিম হিসেবে কবুল করুন। আমীন। তার এই ছোট্ট খেদমত আমাদের সফরের এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকল।
“অবশেষে সোহরাওয়ার্দীতে”
সারারাত পথ চলা। রাত ৩টা ৩০ মিনিট। আমরা পৌঁছে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত ময়দান — সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
সেখানে পৌঁছে চোখ আমার ছানাবড়া। এ কী দৃশ্য! বিশাল প্যান্ডেল কানায় কানায় ভরে গেছে। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাজার হাজার মানুষ গভীর রাতেও জেগে আছে। মঞ্চ থেকে তখন বয়ান করছেন আমাদের মাথার তাজ, শায়খে বরুণী দা.বা.। তাঁর প্রতিটি কথা যেন হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে।
আমরাও দ্রুত অজু-ইস্তেঞ্জা সেরে সেই নূরানী মজলিসে শরীক হয়ে গেলাম। জিকির, দোয়া ও কান্নায় রাতের অন্ধকার আলোকিত হয়ে উঠল। অতঃপর ফজরের আজান হলো, আমরা সবাই একসাথে জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। আলহামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা সেই মহান রবের।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বয়ান, জিকির ও আখেরি দোয়ার হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য নিয়ে ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে লিখব।
সৈয়দ এহসান আহমদ
৩১.১০.২০২৬